Mobile Review

‘টেকনো স্পার্ক ৬ এয়ার’ এর সম্পুর্ণ বাংলা রিভিউ

আজকে আপনাদের জন্য আরো একটি নতুন ফোনের রিভিউ নিয়ে হাজির হয়েছি। ফোনটির নামঃ

Tecno Spark 6 Air

বাংলাদেশে লঞ্চ হয়ে গেলো টেকনোর জনপ্রিয় সিরিজের স্মার্টফোন ‘টেকনো স্পার্ক ৬ এয়ার’ ফোনটি যা একটি লো বাজেটের ফোন।

অফিশিয়ালি ফোনটির সেল ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে বাজারে। বিগত কিছুদিন হলো ফোনটির সাথে আমি টেকনো পোউভিয়ার ৪ এর মিল পেয়েছি। এটা মনে হবার পিছনে যথেষ্ট কারনও রয়েছে যেটার ব্যখ্যা আপনারা রিভিউটি পড়লে পেয়ে যাবেন আশা করছি। মিড রেঞ্জ এর বাজেটের যুগে টেকনো তাদের এই লো- বাজেট ফোনে কি অফার করছে ক্রেতাদের যা তাদের আকৃষ্ট করবে ফোনটি কেনার জন্য সেটা হলো মূল বিষয়। তবে ফোনটি হাতে পাওয়ার পরে প্রথমেই একটি জিনিস চোখে পড়ার মতো ছিল যা হলো ফোনটির বক্সে একটি এয়ারফোন রয়েছে যা অন্যান্য দামী ফোনের সাথেও ইদানীং পাওয়া যায় না। অনেকের কাছে বিষয়টি নজরকাড়া মনে হতে পারে। এখন কথা না বাড়িয়ে চলুন দেখে নেওয়া যাক ফোনটির বিস্তারিত, প্রথমেই কথা বলা যাক ফোনটির ডিজাইন নিয়ে…

ডিজাইন

ফোনটি দেখতে বেশ সুন্দর কিন্তু আকারে বেশ বড়। ফোনটির সামনে একটি ডিসপ্লে রয়েছে যেটার স্ক্রিন ৭.০০ ইঞ্চি। যাদের বড় স্ক্রিনের ফোন অনেক পছন্দ তারা ফোনটি কিনে বেশ উপভোগ করতে পারবেন। কিন্তু যারা বড় পছন্দ করেন না তাদের জন্য ফোনটি হাতে নিতেই আপনার কাছে এটি খারাপ দিক মনে হতে পারে।এক হাতে ফোনটি চালানোও বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কিন্তু,ভিডিও / গেমিং বা মুভি দেখার সময় বড় ডিসপ্লে আপনাকে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করাবে। ফোনটির সামনে ওয়াটার ড্রপ নচ দেওয়া আছে। যা আপনাকে ভিডিও দেখার সময়ে অনেকটা ফুল স্ক্রিনের আনন্দ দিবে। ফোনটির পিছনের ডিজাইন টেকনো পোউভিয়ার ৪ এবং টেকনো স্পার্ক ৫ প্রো সংমিশ্রণে তৈরি করা হয়েছে। ব্যাকপার্টের ডিজাইনটি বেশ আকর্ষনীয়। এবং পুরো ফোনটিই প্লাস্টিক বিল্ডের। এত অল্প বাজেটে গ্লাস বা মেটাল বডির আশা রাখাটাও কিন্তু অনুচিত। ফোনটি ব্যবহার্থে আপনাকে ভাল মানের কেস ব্যবহার করতে হবে অবশ্যই নইলে কয়দিন ইউজের পরেই ফোনের বডিতে স্ক্র্যাচ পড়ে যাবে। ফোনটির পিছনে এলইডি ফ্লাশ এবং এআই ক্যামেরা সহ একটি ট্রিপল ক্যামেরা সেটাপ রয়েছে। সেই সাথে হ্যাডফোন জ্যাক,পাওয়ার বাটন,ভলিউম বাটন, সিম কার্ড স্লট,চার্জার স্লটও রয়েছে যা ফোনের অনুচ্ছেদ্য অংশ। সাথে ফোনে রিয়ার মাউন্টেড ফিংগারপ্রিন্ট সেন্সর দেওয়া আছে। ফোনটির ব্যাটারি বড় হলেও ফোনটি দেখতে বেশ স্লিম তবে ফোনটির ওজন ২০৫ গ্রাম। এর ওয়েট ডিস্ট্রিবিউশনটা খুব ভাল ভাবে করা হয়েছে। ফোনটি বাজারে ২ টা কালারে এভেইলেভল। কমেট ব্ল্যাক এবং অশেন্ট ব্লু।

ডিসপ্লে

টেকনো স্পার্ক ৬ এয়ার ফোনটিতে ডিসপ্লে সেকশনে একটি এইচডি প্লাস আইপি এস এলসিডি প্যানেল দেওয়া হয়েছে। ডিসপ্লেটি ৭২০x১৬৪০ পিক্সেল এবং ২৫৬ পিপিআই পিক্সেল ঘনত্বের রেজোলিউশন সহ বিল্ড করা হয়েছে এবং ফোনটিতে আছে ৭.০০-ইঞ্চি টাচস্ক্রিন ডিসপ্লে। এর ২০.৫ঃ ৯ একটি অনুপাত এবং স্ক্রিন-টু-বডি অনুপাত ৮৪.১৭%। ফোনের ডিসপ্লেতে কালার একিউরিসি মোটামুটি বা ঠিকঠাক বলা গেলেও এটার কমতি রয়েছে মূলত সার্পনেসে। এটা হওয়াটাই কি স্বাভাবিক নয়? ৭.০০ ইঞ্চির বড় ডিসপ্লে স্ক্রিন তার সাথে ফোনটির পিপি আই ডেনসিটি মাত্র ২৭০। তাই এখানে বেশ খানিকটা সার্পনেসের ঘাটতি পাওয়া যায়। তবে যারা কিনা মডারেট ইউজার আছেন তারা ডে টু ডে ইউজে কোনো পার্থক্যই বুঝতে পারবেন না। তবে একটা কথা না বললেই না, ফোনটি বাজেট ফোন হওয়া সত্ত্বেও ফোনটিতে আউটডোর ফিজিবিলিটি বেশ ভাল ছিল। যেহেতু কোম্পানির মূল টার্গেট ছিল কম মূল্যে বড় ডিস্পলে সেহেতু তারা এ লক্ষ্যে সাকসেসফুল। সব মিলে এই দামে ফোনটির এই ডিসপ্লে আপনাকে হতাশ করবে না বলে আশা করা যায়।

ক্যামেরা পারফরম্যান্স

টেকনোর এ ৬ এয়ার ফোনটিতে রিয়ার ক্যামেরায় একটি ট্রিপল ক্যামেরা সেট আপ দেওয়া হয়েছে। তিনটি ক্যামেরা লেন্সই নিজেদের মধ্যে সম্পর্কিত, টেকনো স্পার্ক ৬ এয়ারটির প্রাথমিক ক্যামেরা ১৩ মেগাপিক্সেল;এফ/১.৮ অ্যাপারচার এবং দ্বিতীয়টি ২ মেগাপিক্সেল ডেপ্থ ক্যামেরা সেন্সর। ফোনটিতে আরেকটি এ আই ক্যামেরাও দেওয়া হয়েছে। সেই সাথে এর ফিচারে কিছু বৈশিষ্ট্য এড করা হয়েছে- ডিজিটাল জুম, অটো ফ্ল্যাশ, ফেস সনাক্তকরণ, টাচ ফোকাস ইত্যাদি। এবং সেলফি তোলার জন্য সামনে একটি ৮- মেগাপিক্সেল;এফ/২.০ অ্যাপারচার ;ক্যামেরা প্রদান করা হয়েছে। এবার আসি ক্যামেরার পারফরম্যান্স নিয়ে। ডেলাইট এবং লো লাইট উভয় অবস্থায় এর ক্যামেরা বেশ ভাল পরফর্ম করেছে এর বাজেট অনুযায়ী যা ফোনটি ক্রয়ের ক্ষেত্রে একটি প্লাস পয়েন্ট এড করে। তবে সার্পনেসের অনেকটাই ঘাটতি রয়েছে যা আমার কাছে বড় কোনো ইস্যু মনে হয়নি। কারন এ রেঞ্জের ফোনগুলির পিকচার কোয়ালিটি এরকমই হয়ে থাকে। এই ফোনের ফ্রন্ট ক্যামেরায় দেওয়া ৮ এমপি সেলফি ক্যামেরা দিয়েও আপনারা ডেলাইটে বেশ সুন্দর সুন্দর সেলফি ক্যাপচার করতে পারবেন। তবে লো লাইটে ক্যামেরাটি খুব একটা ভাল পারফরম্যান্স দেখাতে সক্ষম হয়না। তবে ফোনে ভিডিও কোয়ালিটির মানটি বেশ খারাপ এবং ৭২০পি বা এইচডি ও সমর্থন করে না।

কর্মক্ষমতা

চিপসেট সেকশনে ফোনটিতে ব্যবহার করা হয়েছে মিডিয়াটেক হেলিও এ ২২(এমটি ৬৭৬১)প্রসেসর এবং এর ক্লক স্পিড হলো ২.০ গিগাহার্জ। এটি একটি কোয়াড কর প্রসেসর। এটি ২টি ভ্যারিয়েন্টে পাওয়া যায়।২/৩ জিবি র্যাম এবং ৩২/৬৪ জিবি। টেকনো স্পার্ক ৬ এয়ার অ্যান্ড্রয়েড ১০ এবং এটি ৬০০০ এমএএইচ ব্যাটারি দ্বারা চালিত। ফোনটি অ্যান্ড্রয়েড ১০ এর উপর ভিত্তি করে এইচআইওএস ৬.২ চালায় এবং একটি উত্সর্গীকৃত স্লট সহ মাইক্রোএসডি কার্ডের মাধ্যমে বাড়ানো যায় এর এক্সটার্নাল স্টোরেজ। এই প্রসেসর দ্বারা আপনারা খুব হেভি আকারে গেমিং করতে পারবেন না। এই ফোনে খুব আরাম করে ফ্রি ফায়ার স্ট্যান্ডার্ড গ্রাফিক্সে খেলতে পারবেন তবে এই ফোনে পাবজি খেলা বেশ কষ্টসাধ্য। কারন,এ ২২ এর প্রসেসরগুলোতে পাবজি খুব ভাল ভাবে এক্সপ্রেস করা যায় না। এই ফোনে বেশ ওভার হিটিং ইস্যু রয়েছে। হেলিও এ ২২ একটি লো রেঞ্জের চিপসেট তাই আপনারা যদি এটি হেভি ইউজ করেন তাইলে এটি বেশ হিট হবে- এটাই স্বাভাবিক। তাই আমার সাজেশন থাকবে এই ফোন দিয়ে হেভি আকারে গেমিং না করার। সিকিউরিটির ক্ষেত্রে ফোনে রিয়ার মাউন্টেড ফিংগারপ্রিন্ট স্ক্যানার এবং ফেস আনলক ব্যবহার করা হয়েছে। আমি পরীক্ষা করে দেখলাম স্ক্যানারটি বেশ ফাস্ট কাজ করে। আংগুল দিয়ে স্পর্শ করা মাত্রই খুব দ্রুত আনলক করা ফেলছিল। ফোনের কল কোয়ালিটি এবং সাউন্ড ছিল বেশ ভাল যা নিয়ে আনার কোনোই অভিযোগ নেই। সেই সাথে ফোনের স্পিকার কোয়ালিটিও ছিল বেশ লাউড যা দিয়ে যেকোনো মিডিয়া ওয়াচিং আপনি বেশ আরামেই করতে পারবেন।

ব্যাটারি

এই ফোনের সবচেয়ে দৃষ্টিকাড়া সাইড হলো এর ব্যাটারি প্যাক। ফোনটিতে দেওয়া হয়েছে বিশাল দানব আকারের একটি ৬০০০এমএএইচ এর ব্যাটারি ব্যাক আপ। এই সেম ব্যাটারি সেট আপ টেকনো ব্যবহার করেছিল তাদের পোউভিয়ার ৪ এ। এবং এই ২ টি ফোনের ব্যাটারি ব্যাক আপ ও একই রকম। আপনি হেভি ইউজেও টানা ১১ ঘন্টা অন-স্ক্রিন ব্যাক আপ পাবেন। আর চার্জিং এর ক্ষেত্রে এর বক্সে থাকা চার্জারটি দিয়ে ফুল চার্জ করতে লাগবে প্রায় সাড়ে ৩ ঘন্টার মতো।কারন এতে কোনো ফাস্ট চার্জার ব্যবহার করা হয়নি। এত বড় ব্যাটারি থাকলেও ফোনটি দেখতে বেশ স্লিম তবে ফোনটির ওজন বেশি।

ভাল দিক

1.ফোনটির ডিজাইন বেশ ভাল
2.কম বাজেটে ভাল ডিসপ্লে
3.বাজেট ফোন হিসেবে ক্যামেরা পারফরম্যান্স ও ভাল।
4.বিশেষত ফোনটির মারাত্মক ব্যাটারি ব্যাক আপ।
5.দামি ইয়ারফোন।

খারাপ দিক

1.ফোনটির চার্জিং টাইম অনেক বেশি।
2.লো চিপসেট কোয়ালিটি।

শেষ মন্তব্য

ফোনটির বাজেট দিক গত কোন অভিযোগ ফোনটির সাথে আসলে যায় না। চার্জিং টাইম বেশি লাগার কারন হলো ফোনটি লো বাজেটের হওয়ায় ফোনটিতে ফাস্ট চার্জিং প্রোভাইড করা হয়নি। স্টার্টারদের জন্য ফোনটি এত কম রেঞ্জে খুব ভাল একটা অপশন যেখানে আপনি ডে-টু- ডে ইউজ খুব ভালভাবেই করতে পারবেন। তবে আপনি যদি গেম আসক্ত হন বা আপনার ফোন কেনার কারন যদি গেমিং হয়ে থাকে তবে আপনাকে অবশ্যই অন্য কোন অপশন দেখতে হবে। আর আপনার বাজেট বেশি হলে আপনি অন্যান্য কোম্পানির মিড- রঞ্জের সেটগুলি দেখতে পারেন। তবে কম বাজেটে সুন্দর ডিজাইন,মারাত্মক ব্যটারি লাইফ,বড় ডিসপ্লে এবং ভাল ক্যামেরা চাইলে এই মূল্যে টেকনো স্পার্ক ৬ এয়ার ফোনটি আপনার জন্য একটি উপহার হতে পারে।

Shakil Ahamed

চেষ্টা করলে সফল অবশ্যই হওয়া যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button